News desk bd

নিউজ ডেস্ক বিডি

খামেনি আর নেই! প্রতিশোধ নিতে মরিয়া ইরান

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে সম্ভবত গত কয়েক দশকের সবচেয়ে বড় ভূমিকম্পটি ঘটে গেল রোববার (১ মার্চ)। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক জোটের এক দুঃসাহসিক ও প্রাণঘাতী অভিযান—’অপারেশন এপিক ফিউরি’-র আঘাতে নিহত হয়েছেন ইরানের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী, সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। ফার্স নিউজ এজেন্সি এবং ইরান ইন্টারন্যাশনালের মতো সংবাদমাধ্যমগুলো এই খবরের সত্যতা নিশ্চিত করার পর পুরো ইরানে ৪০ দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করা হয়েছে। খামেনির মৃত্যু কেবল একজন নেতার প্রস্থান নয়; এটি এমন এক স্ফুলিঙ্গ, যা পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে এক সর্বনাশা যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে পারে।

ট্রাম্পের দম্ভোক্তি ও নিখুঁত নিশানার দাবি খামেনির মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হতেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যালে’ বিজয়োল্লাস প্রকাশ করেন। তিনি খামেনিকে “ইতিহাসের অন্যতম নিকৃষ্ট ব্যক্তি” আখ্যা দিয়ে দাবি করেন যে, এই নিকেশের মাধ্যমে অসংখ্য আমেরিকান এবং বিশ্ববাসীর জন্য সুবিচার প্রতিষ্ঠিত হলো।

ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী, মার্কিন ও ইসরায়েলি গোয়েন্দাদের অত্যাধুনিক ট্র্যাকিং সিস্টেম এতটাই নিখুঁত ছিল যে, খামেনি বা তার শীর্ষ সহযোগীদের পালানোর কোনো সুযোগই ছিল না। ট্রাম্প কেবল মৃত্যু নিশ্চিত করেই থামেননি, তিনি এক মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধও শুরু করেছেন। তার দাবি—ইরানের রেভোল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি), সেনাবাহিনী এবং পুলিশের অনেক সদস্য নাকি যুদ্ধ না করে আমেরিকার কাছে দায়মুক্তির (ইমিউনিটি) প্রার্থনা করছে। যারা দ্রুত আত্মসমর্পণ করবে না, তাদের কপালে “নির্ঘাত মৃত্যু” আছে বলেও কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি। রয়টার্স, সিএনএন এবং বিবিসির মতো আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোও মার্কিন ও ইসরায়েলি এই যৌথ হামলায় খামেনির নিহতের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।

‘প্রতিশোধ নিতে মরিয়া ইরান’: আইআরজিসি-র পাল্টা হুঁশিয়ারি ট্রাম্প যখন ইরানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের স্বপ্ন দেখছেন, বাস্তব চিত্র তখন সম্পূর্ণ ভিন্ন। খামেনির মৃত্যুর খবরে পুরো ইরানে শোকের পাশাপাশি জ্বলছে প্রতিশোধের আগুন। ইরানের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক ও রাজনৈতিক শাখা ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) ফার্স নিউজ এজেন্সিতে দেওয়া এক বিবৃতিতে এই হত্যাকাণ্ডের কঠোর জবাব দেওয়ার অঙ্গীকার করেছে।

আইআরজিসি খামেনিকে একজন “মহান নেতা” হিসেবে উল্লেখ করে বলেছে, “মানবতার সবচেয়ে জঘন্য সন্ত্রাসী ও জল্লাদদের হাতে তাঁর এই শাহাদাত তাঁর বৈধতা এবং অকৃত্রিম সেবারই প্রমাণ।” তারা ট্রাম্প বা ইসরায়েলকে কোনো ছাড় না দেওয়ার স্পষ্ট বার্তা দিয়ে বলেছে, “ইরানি জাতির প্রতিশোধের হাত… তাদের কিছুতেই ছেড়ে দেবে না।”

একইসঙ্গে ট্রাম্প যে অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, তার কড়া জবাব দিয়ে আইআরজিসি জানিয়েছে—দেশি ও বিদেশি যেকোনো ষড়যন্ত্র মোকাবিলায় তারা আগের চেয়ে আরও বেশি দৃঢ় অবস্থানে থাকবে।

বাস্তবতার নির্মম বিশ্লেষণ একজন নিরপেক্ষ ও বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষক হিসেবে বলতে গেলে, ট্রাম্প এটিকে একটি চূড়ান্ত বিজয় হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করলেও, বাস্তবতা অত্যন্ত জটিল ও রক্তক্ষয়ী। আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মতো একজন আধ্যাত্মিক ও রাজনৈতিক সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যু ইরানিদের মনোবল পুরোপুরি ভেঙে দেবে—এমনটা ভাবা বোকামি। বরং এই হত্যাকাণ্ড আইআরজিসি এবং ইরানের কট্টরপন্থীদের আরও বেশি বেপরোয়া করে তুলতে পারে। “দেশ ফিরে পাওয়ার” যে কথা ট্রাম্প বলেছেন, আইআরজিসি-র অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্র দমনের হুঁশিয়ারি প্রমাণ করে যে—ইরানের ভেতরে এখন এক ভয়াবহ শুদ্ধি অভিযান ও রক্তপাত শুরু হতে পারে।

‘খামেনি আর নেই’—এটি যেমন সত্য, তেমনি ‘প্রতিশোধ নিতে মরিয়া ইরান’ কোনো ফাঁকা বুলি নয়। মধ্যপ্রাচ্য এখন এমন এক বারুদের স্তূপে পরিণত হলো, যেখানে ট্রাম্পের এই ‘সুবিচার’ বিশ্বকে একটি সর্বাত্মক যুদ্ধের দিকে টেনে নিয়ে যেতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *